Land Registration BD

দলিলের উদ্ভব এবং রেজিস্ট্রেশন আইন ও বিধিমালার প্রবর্তন

এ অঞ্চলে বৃটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে দলিল শব্দটি সাধারণ মানুষের অজ্ঞাত ছিল। তখন সাধারণ মানুষের উন্নত মূল্যবোধ ও নৈতিকতার কারণে পরস্পরের প্রতি আস্থা ও গভীর বিশ্বাসের ভিত্তিতে মৌখিকভাবেই জমি-জমাসহ সম্পত্তি হস্তান্তর হতো; বিশ্বাসভঙ্গের নজির ছিল অত্যন্ত বিরল। বৃটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ অঞ্চলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, লোভ, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা, বিদ্বেষ- সমাজকে কলুষিত করে এবং মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়। ঐ পরিস্থিতিতে জমি-জমাসহ অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে চুক্তি, দলিল-দস্তাবেজ আকারে লিপিবদ্ধ, রেজিস্ট্রি ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনে কালত এ অঞ্চলে দলিল এবং দলিলের রেজিস্ট্রেশন প্রথার উদ্ভব হয়েছে। দলিল রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজনে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে রাজা তৃতীয় জর্জের শাসনামলে সর্বপ্রথম এ অঞ্চলে বঙ্গীয় বিধিবদ্ধ আইন (The Bengal Statute) প্রণীত হয়। এরপর ১৭৯০ সালের ৩৬নং বেঙ্গল রেগুলেশন, ১৭৯৩ সালের ৩১নং রেগুলেশন, ১৮০২ সালের ৪নং বোম্বে রেগুলেশন, ১৭নং মাদ্রাজ রেগুলেশন-এর মাধ্যমে এর উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটে। এ আইনগুলি ছিল প্রাদেশিক বা প্রেসিডেন্সি প্রকৃতির। এছাড়া, রেজিস্ট্রেশনের প্রায়োগিক কারণে ১৮২৪ সালের ৪ নং রেগুলেশন, ১৮৩২ সালের ৭নং রেগুলেশন, ১৮৩৮ সালের ৩০নং আইন এবং ১৮৫১ সালের ১১নং আইন প্রণীত হয়। ১৮৬৪ সালের ১৬নং আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক (প্রেসিডেন্সি) আইনের পরিবর্তে সময় ভারতবর্ষে রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে সাধারণ আইন প্রবর্তন করা হয়। এ আইনে সকল দলিলকে দু’টি শ্রেণিতে বিন্যাস করা হয়, যথা- (১) বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রিযোগ্য দলিল, এবং (২) ঐচ্ছিক রেজিস্ট্রিযোগ্য দলিল। ১৮৬৫ সালের ২০নং আইন, ১৮৬৬ সালের ২০নং আইন, ১৮৭১ সালের ৮ নং আইন এবং ১৮৭৭ সালের ৩নং আইনের পর ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬নং আইনের মাধ্যমে বর্তমান রেজিস্ট্রেশন আইন প্র হয়েছে এবং ১৯১৭ ও ১৯৬২ সালে সংশোধিত হয়েছে। এ অঞ্চলে বিট্রিশ সাম্রাজ্যের পতন তথা ভারত বিভাজনের ফলে পাকিস্তান সৃষ্টি হয় এবং ১৯৪৯ সালে এ আইনটি পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশেই অভিযোজন ( adapted) করা হয়। পরবর্তীতে আইনটি সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে পাকিস্তানে পর্যায়ক্রমে ১৯৫০, ১৯৫৭, ১৯৬০, ১৯৬১ এবং ১৯৬২ সালে এ আইনে বিভিন্ন সংশোধন করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৯ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আইনটি বাংলাদেশে গৃহীত ও বলবৎ হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৭৩, ১৯৮৫, ১৯৮৭, ২০০২, ২০০৪, ২০০৬ এবং ২০১২ সালে রেজিস্ট্রেশন আইনটি সংশোধিত হয়েছে।

রেজিস্ট্রেশন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকল্পে ১৯২৮ সালে প্রথম নিবন্ধন বিধিমালা (Registration Rules) এবং নিবন্ধন সারগ্রন্থ (Registration Manual) প্রণীত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫৮ সালে এবং ১৯৬৬ সালে নিবন্ধন বিধিমালার কিছু সংশোধন করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নিবন্ধন বিধিমালা, ১৯৭৩ প্রণীত হয়। বাংলাদেশ নিবন্ধন বিধিমালা, ১৯৭৩ এবং মহা-পরিদর্শক, নিবন্ধন-এর নির্দেশনা (Instructions) সম্বলিত রেজিস্ট্রেশন ম্যানুয়াল ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং উক্ত ম্যানুয়ালের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন বিভাগের অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। নতুনভাবে উদ্ভাবিত কোনো বিষয় বা সমস্যা মহা-পরিদর্শক, নিবন্ধন বা ক্ষেত্রমত মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রশাসনিক নির্দেশনা/পরিপত্র জারির মাধ্যমে নিরসন করা হয়েছে। সময়ের চাহিদার প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন ম্যানুয়াল হালনাগান করা হয়েছে এবং এস.আর.ও নং ২৭৫-আইন/২০১৪ তারিখ ০২ ডিসেম্বর, ২০১৪ মূলে “বাংলাদেশ নিবন্ধন। বিধিমালা, ১৯৭৩ রহিতক্রমে নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৪ প্রণীত হয়েছে, যার ইংরেজি পাঠ ২৬ অক্টোবর, ২০১৪ তারিখে এবং বাংলা বয়ান ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ও ১৬ নভেম্বর, ২০১৪ তারিখ হতে কার্যকর হয়েছে।

১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১-এর রুজ (২) অনুযায়ী সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলাসমূহকে এ আইনের আওতা বহির্ভূত হিসেবে ঘোষণা করায় উক্ত জেলাসমূহে এ আইনের বিধানসমূহ অন্যাবধি প্রযোজ্য নয়। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এবং নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৪-এর বিধি-বিধানের সাথে বহুলাংশে সামজস্যতা থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কর্মকাত ভিন্ন আইনের আওতায় ভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। রেজিস্ট্রেশন আইনের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সময়ের প্রয়োজনে দেশের সকল নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন সংক্রান্ত মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকল্পে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার সম্পত্তির দলিলাদিও রেজিস্ট্রেশনের জন্য অভিন্ন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি ও বিধিবিধান অনুসরণ নিশ্চিতকল্পে রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ কার্যকর করা সমীচীন মনে হয়।

Md. Shahazahan Ali

Add comment

error: Content is protected !!